মার্কেন্টাইলের পর্ষদ বাতিলের উদ্যোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালকদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা এবং অনিয়ম দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষায়িত তদন্ত দল। এর প্রেক্ষিতে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, পরিচালকদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের বিপুল অর্থ তছরুপ এবং বেআইনি কর্মকান্ডের অভিযোগ পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর গত এপ্রিল মাস থেকে টানা তদন্ত চালিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষায়িত পর্যবেক্ষক দল। এই বিশেষ পর্যবেক্ষণে পরিচালকদের বিপুল অর্থ লোপাট ও বেআইনি কর্মকান্ডের প্রমাণ মিলেছে। ফলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দেওয়ার সুপারিশ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা প্রতিবেদনটি ধামাচাপা দিতে সক্রিয় হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জোগসাজশে শাস্তি থেকে বাঁচতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্যরা।
জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা পড়ার বিষয়টি গভর্নরের নজরে আনেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একজন শেয়ার হোল্ডার। এরপর গভর্নরের নির্দেশে আরও বিশদ তদন্ত শুরু করে নিরীক্ষা দল। সম্প্রতি তদন্ত কর্মকর্তারা কয়েক দফায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এসে নথিপত্র পরীক্ষা করেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত দলের জিজ্ঞাসাবাদে সদোত্তর দিতে না পারায় ব্যাংকটির চীফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) তাপস চন্দ্র পালকে শোকজ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাকে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি প্রমাণ হওয়ার পরও পরিচালকদের বিরুদ্ধে শাস্তি না হলে বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের ব্যাংক খাতের দুর্নীতি ও অপশাসন আবার ফিরে আসবে। তদন্ত কর্মকর্তাদের সুপারিশের প্রেক্ষিতে ব্যাংকটির বোর্ড অবিলম্বে ভেঙে দিয়ে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা নতুন বোর্ড গঠনের পরামর্শও দেন বিশ্লেষকরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দাখিল করা অভিযোগপত্রে মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি’র পরিচালনা পর্ষদের নজিরবিহীন দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অপরাধের খতিয়ান
ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান এম এ খান বেলাল। যিনি মানবপাচার মামলার আসামি এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের প্রভাবশালী নেতাদের সিন্ডিকেটভুক্ত। বর্তমানে পর্ষদে থাকা অন্য পরিচালকেরাও আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে এই লুটেরা সিন্ডিকেট বজায় রেখেছেন।
মিটিং সম্মানীর নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম লঙ্ঘন
আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের প্রতিটি সভায় অংশ নেওয়ার জন্য একজন পরিচালক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সম্মানী পেতে পারেন। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বোর্ড মিটিংয়ে প্রতি পরিচালককে ১ লাখ টাকা করে সম্মানী দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকটির সাসপেন্স অ্যাকাউন্ট থেকে চেয়ারম্যানসহ পরিচালকেরা প্রতি মিটিংয়ে এই বাড়তি অর্থ তুলে নিচ্ছেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
শীতবস্ত্র ও কম্বল ক্রয়ের নামে জালিয়াতি
ব্যাংকটির সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম ঘিরেও মিলেছে ভয়াবহ জালিয়াতির প্রমাণ। প্রতি বছর শীতকালে বিতরণের জন্য বোর্ড থেকে ৩ হাজার টাকা মূল্যের ২ লাখ উচ্চমানের কম্বল ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু পরিচালকেরা নিজেদের মধ্যে যোগসাজশ করে ভেন্ডরদের মাধ্যমে ২ লাখ কম্বলের ভুয়া অর্ডার দেখান। বাস্তবে মাত্র ২০ হাজার কম্বল সংগ্রহ করা হলেও নথিপত্রে বাকি ১ লাখ ৮০ হাজার কম্বলের পুরো টাকা পরিচালকেরা আত্মসাৎ করেন। এমনকি যে ২০ হাজার কম্বল কেনা হয়েছে, সেগুলোও ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের—যার প্রতিটির বাজারমূল্য ১ হাজার টাকারও কম।
হাসপাতাল প্রকল্পের ২৫ কোটি টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা
অনুসন্ধানে ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় আর্থিক জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে ঢাকার উত্তরায় নিজস্ব জমিতে একটি হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। হাসপাতালটি তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রাথমিকভাবে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অর্থ বরাদ্দের ঠিক পরদিনই সেই পুরো টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা এই ২৫ কোটি টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেন। বাস্তবে সেই হাসপাতাল আজ পর্যন্ত নির্মিত হয়নি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অডিটে বিষয়টি ধরা পড়লে পরিচালকেরা চাপের মুখে নামমাত্র কিছু টাকা ফেরত দিলেও বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থই এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ক্যালেন্ডার ও ডায়েরি মুদ্রণেও হরিলুট
শুধু শীতবস্ত্রই নয়, ব্যাংকের প্রচারণামূলক সামগ্রী মুদ্রণ খাতেও বসেছে দুর্নীতির হাট। প্রতি বছর ব্যাংকটির পক্ষ থেকে ২ লাখ পিস করে ওয়াল ক্যালেন্ডার, ডেস্ক ক্যালেন্ডার ও ডায়েরি তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু পরিচালকেরা নিজেদের সুবিধামতো সিদ্ধান্ত বদলে প্রতি আইটেম মাত্র ২০ হাজার পিস করে তৈরি করেন। নথিপত্রে পুরো ২ লাখ পিসের খরচ দেখিয়ে বাকি ১ লাখ ৮০ হাজার পিসের সমপরিমাণ অর্থ পরিচালকেরা নিজেদের পকেটে পুরেছেন।
দাতব্য তহভিলের টাকাও পরিচালকদের পকেটে
ব্যাংকটির সামাজিক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ‘আব্দুল জলিল ফাউন্ডেশন’ নিয়েও বসেছে জালিয়াতির মেলা। ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মোট লভ্যাংশের ২ শতাংশ এই ফাউন্ডেশনে জমা রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা থেকে বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক কাজে সহযোগিতা করার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেবামূলক খাতে ব্যয় কিংবা দান করার পরিবর্তে পরিচালকেরা নিজেদের নামে-বেনামে বিভিন্ন ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে এই ফাউন্ডেশনের টাকা নিয়মিত উত্তোলন ও আত্মসাৎ করেছেন।
জুলাই হত্যাকাণ্ডে পরিচালকদের সম্পৃক্ততা ও ফৌজদারি মামলা
আর্থিক কেলেঙ্কারির পাশাপাশি এই পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে গত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার যৌক্তিক দাবির বিরোধিতা এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার পেছনে এই পর্ষদের প্রভাবশালী পরিচালকেরা জড়িত ছিলেন। ইতিমধ্যেই মার্কেন্টাইলের পরিচালকদের মধ্যে আব্দুল আউয়াল এবং ফিরোজ খান শাহবাগ থানার হত্যা মামলায় এবং আকরাম হোসেন হুমায়ুন মতিঝিল থানার হত্যা মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত ও আসামি হয়েছেন। আর্থিক অপরাধের সীমা ছাড়িয়ে ছাত্র-জনতার রক্তের দাগও এখন এই লুটেরা পর্ষদের গায়ে লেগেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দাখিল করা অভিযোগ পত্রে।
প্রতিষ্ঠাতাদের তাড়িয়ে রাজনৈতিক দখলদারিত্ব
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা ও উত্থানের পেছনে যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সেই প্রকৃত স্পন্সর বা মূল উদ্যোক্তাদের কেউই এখন আর ব্যাংকটিতে নেই। ২০১৮ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম মূল উদ্যোক্তাদের একরকম জোরপূর্বক ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেন। পুনর্গঠিত এই পর্ষদের পরিচালকেরা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ফিরোজ আলম, শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুল আউয়াল এবং ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের নেতা আকরাম হোসেন। পর্ষদের এই রাজনৈতিক আধিপত্যকে কাজে লাগিয়েই পরবর্তীতে ব্যাংকটিতে একের পর এক আর্থিক জালিয়াতি চালানো হয়।
চেয়ারম্যান বেলাল খানের মানবপাচারের অন্ধকার অতীত
ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বেলাল খান। ব্যাংকিং খাতের বাইরে দেশের জনশক্তি রপ্তানি বা ‘আদম ব্যবসা’ খাতে তিনি অত্যন্ত বিতর্কিত এক মুখ। অভিযোগ রয়েছে, সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মানবপাচারের সময় ট্রলারডুবিতে শতাধিক মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে বেলাল খানের রিক্রুটিং এজেন্সি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। এই মানবপাচার ও মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় বিগত সরকারের আমলেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। তবে পরবর্তীতে বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন এবং পরবর্তীতে ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ
এসব নজিরবিহীন দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিষয়ে জানতে ব্যাংকটির বর্তমান পর্ষদের একাধিক সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত বক্তব্য পাঠালেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।









